ঢাকা, শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২০, ১৫ কার্তিক, ১৪২৭
ভবনসহ সবই আছে, নেই কার্যক্রম

ট্রাস্ট হাসপাতাল বন্ধ ২৫ বছর

মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থাপিত ট্রাস্ট আধুনিক হাসপাতাল ২৫ বছর ধরে বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। এর বহুতল (চার তলা) ভবন আছে।

আলট্রাসনোগ্রাম, প্যাথোলজি, এক্সরে, ইসিজি ও এনডোস্কপি কক্ষ আছে। তালাবদ্ধ রুমে চেয়ার টেবিল, খাট, ফ্যান- সবই আছে। নিরাপত্তারক্ষীরা এখন পাহারা দিচ্ছেন।

শুধু নেই হাসপাতাল পরিচালনার জন্য লোকবল ও সদিচ্ছা। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সেবায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নানা স্থানে নতুনভাবে হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু করা হয়েছে।

কিন্তু কেউ পরিত্যক্ত ট্রাস্ট আধুনিক হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবা চালুর উদ্যোগ নেয়নি। ঢাকার মিরপুরে ১৯৯১ সালে এই হাসপাতাল চালু হয়। ১৯৯৫ সালের পর থেকে বন্ধ হয়ে পড়ে আছে।

ট্রাস্ট আধুনিক হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা চালু হলে সরকারের অনেক টাকা সাশ্রয় হতো বলে মনে করেন স্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অনেক স্থানে নতুন হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র করতে গিয়ে স্থাপনা নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় সব কিনতে হয়েছে।

কিন্তু এখানে বহুতল ভবনসহ প্রায় সবই আছে। খুব সহজেই এটা ব্যবহারযোগ্য করে নেয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কেউ সেই পথে হাঁটেননি।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন, এই হাসপাতালের কার্যক্রম আর পরিচালিত হবে না। এটি নতুন করে পরিচালনার কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই। এছাড়া এটি পরিচালনায় প্রয়োজনীয় জনবল ও অর্থায়ন জোগাড় করাও সম্ভব হয়নি। এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য স্বল্পব্যয়ে আবাসন গড়ে তোলা হবে।

এজন্য হাসপাতাল সংলগ্ন জমি বরাদ্দ পেতে ভূমি মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তবে বাদ সেধেছে বিমান মন্ত্রণালয়। তাদের মতে, এই এলাকাটি ফ্লাইং জোন। এখানে ৫ তলার উপরে ভবন নির্মাণ করা যাবে না। আমাদের পরিকল্পনা ছিল ২০ তলা ভবন নির্মাণের। আগামী বোর্ড সভায় এ বিষয়ে আলোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের পদস্থ দুই কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, এই হাসপাতালটি কল্যাণ ট্রাস্টের নয়। এটি ট্রাস্ট ফান্ড নামে অপর একটি প্রতিষ্ঠানের। বর্তমানে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্ববধানে এই ট্রাস্ট রয়েছে। ২৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত একটি বোর্ড সভায় এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

রোববার সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতাল ভবনটি প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সসহ অন্যান্য যানবাহনে গাছপালা গজিয়ে উঠেছে।

নিচতলার বিভিন্ন কক্ষের সামনে নামফলকগুলো এখনও আছে। প্রবেশপথে ঢুকে গেট পেরোলেই ডানদিকে পড়বে জরুরি বিভাগ লেখা কক্ষ। তার ভেতরে তিনটি খাট, চেয়ার-টেবিল রয়েছে। আছে ফ্যানও।

শুধু চিকিৎসক ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নেই। জরুরি বিভাগের কক্ষটি এখন নিরাপত্তাকর্মীদের থাকার জায়গায় পরিণত হয়েছে। রয়েছে আলট্রাসনোগ্রাম, প্যাথোলজি, এক্সরে, ইসজি ও এনডোস্কপি কক্ষ। পরিত্যক্ত ফাইলপত্র ও আবর্জনায় বন্ধ হয়েছে ওপরে ওঠার সিডি। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে পরিত্যক্ত দুটি অ্যাম্বুলেন্সসহ বেশ কয়েকটি গড়ি পড়ে আছে।

অ্যাম্বুলেন্সের ফাঁকফোকরে বেশ বড় বড় গাছ গজিয়েছে। পাশেই হাসপাতালে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত একটি ব্যক্তিগত গাড়ি বা প্রাইভেট কার, ভ্যান, অটোরিকশাসহ কিছু যানবাহন পড়ে আছে। সবগুলোর অবস্থা জরাজীর্ণ, শোচনীয়। অনেকটা পোড় বাড়িতে পরিণত হয়েছে হাসপাতাল ভবনটি। গড়িগুলোয় এখন পোকা-মাকড়ের ঘরবসতি।

এ সময় কথা হয় নিরপত্তারক্ষী সোহেল ও মো ইউনুসের সঙ্গে। তারা জানান, দুই যুগের বেশি সময় ধরে হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। নিচতলার দুটি রুম ছাড়া বাকি রুমগুলো সিলগালা করা। একটি রুমে তাবানি বেভারেজের কয়েকজন কর্মচারী প্রতিদিন ৯টা থেকে ২টা পর্যন্ত অফিস করেন। এছাড়া আর কেউ এদিকে আসেন না।

এই দুজনের একজন জানান, তিনি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই তাবানি বেভারেজে কাজ করে আসছেন। তিনি এই ট্রাস্টের অনেক কিছুরই উত্থান-পতন দেখেছেন।

মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ও মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ফরাসি সরকারের আর্থিক সহায়তায় ট্রাস্ট আধুনিক হাসপাতাল গড়ে ওঠে। ফরাসি অর্থায়নে তখন দুই বছর এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ফরাসি সরকারের দেয়া দুটি অ্যাম্বুলেন্স ওই সময়ে আধুনিক সুবিধা সংবলিত ছিল। এমনকি ওই অ্যাম্বুলেন্স দুটিতে অস্ত্রোপচারের সুবিধাও ছিল। সে সময় জরুরি বিভাগটি ২৪ ঘণ্টা চালু থাকত। তবে রোগীর সংখ্যা একেবারেই কম ছিল।

১৯৯৩ সালে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হাসপাতালটি ইজারা নিয়ে ‘ইসলামী উম্মাহ মেডিকেল কলেজ’ নামে দুই বছর চালায়। তবে তারাও বেশি দিন চালায়নি। তারপর ১৯৯৫ সাল থেকে হাসপাতালটি একেবারেই অযত্নে পড়ে আছে। এর আগে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে ‘ট্রাস্ট ফান্ড’ নামে একটি ফান্ড গঠন করেন।

স্বল্প খরচে মুক্তিযোদ্ধাদের আবাসনসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়ার লক্ষ্যে এই ফান্ড গঠন করা হয়। ফান্ড গঠনের ক্ষেত্রে তৎকালীন ধনী ব্যক্তি, মন্ত্রিসভার সদস্যরা সহায়তা করেন। এমনকি দেশের সিনেমা হলগুলোর বিক্রীত টিকিট থেকে একটি অংশ ওই ফান্ডে দেয়ারও নির্দেশনা ছিল। এতে ফরাসি সরকারও বড় অঙ্কের অর্থ দেয়।

সেই ‘ট্রাস্ট ফান্ডের’ অর্থায়নে ১৯৯১ সালে রাজধানীর মিরপুরে চিড়িয়াখানা সড়কে (বীরবিক্রম হেমায়েত উদ্দিন সড়কে) স্থাপন করা হয় আধুনিক হাসপাতাল।

সূত্র জানায়, ট্রাস্ট ফান্ডের মতো মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের অধীনে থাকা বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের অবস্থা একই রকম। ১৯৭২ সালে ট্রাস্টের অধীনে ৩২টি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান দেয়া হয়। এগুলো একে একে বন্ধ হতে শুরু করে আশির দশক থেকে। এখন শুধু পূর্ণিমা ফিলিং অ্যান্ড সার্ভিস স্টেশন, মিমি চকোলেট লিমিটেড ও ইস্টার্ন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ চালু রয়েছে।

মন্তব্য করুন