ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ৭ আশ্বিন, ১৪২৭
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের কাজ বন্ধ

ত্রুটি চিহ্নিত, আটকে যাবে বেশি উচ্চতার যানবাহন

সরকারের ফাস্ট ট্র্যাক- পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে ভয়াবহ ত্রুটি চিহ্নিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চলতি মাসের শুরু থেকে প্রকল্পটির কাজ বন্ধ আছে।

এ ত্রুটি দূর করা না হলে মূল সেতু (পদ্মা সেতু) দিয়ে বেশি উচ্চতার যানবাহন (ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ও লরি) চলাচল করতে পারবে না। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

আরও জানা গেছে, মূল সেতুর দুই প্রান্তে হরাইজন্টাল (অনুভূমিক) ও ভার্টিক্যাল (উল্লম্ব)- দু’দিকেই ত্রুটি ধরা পড়ে।

আন্তর্জাতিকভাবে সড়কপথের হেডরুম স্ট্যান্ডার্ড হল হরাইজন্টাল ১৫ মিটার, ভার্টিক্যাল ৫ দশমিক ৭ মিটার থাকতে হবে। কিন্তু রেল প্রকল্পে ভার্টিক্যাল রাখা হয়েছে ৪ দশমিক ৮ মিটার।

এ ত্রুটির দায় নিতে চাচ্ছে না কেউ। একে অপরকে দোষারোপ করেছেন পদ্মা সেতু এবং পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্প পরিচালকরা।

পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, যেখানে ত্রুটি চিহ্নিত করা হয়েছে সেটি সারাতে হলে পুরো প্রকল্পে এর প্রভাব পড়বে। ইতোমধ্যে পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তে থাকা ১৭৩টি পিলারের মধ্যে ৫০ শতাংশ পিলারের কাজ সম্পূর্ণ হয়ে গেছে।

পিলারের ওপর স্থাপিত ১৭৪টি গার্ডারের মধ্যে ২৪টি বসানো হয়ে গেছে। এক হাজার ৬১টি পিলার পাইল শতভাগ করা হয়েছে। এমন অবস্থায় ২৫ নম্বর পিলার বরাবর ৫ দশমিক ৭ মিটার উঁচু করা কিছুতেই সম্ভব নয়।

তবে এর সমাধান করতে হলে স্থাপিত পুরো পিলার, গার্ডার ও পাইল কম-বেশি ভাঙতে হবে। প্রকল্প সূত্র বলছে, ২০১৫ সালের চূড়ান্ত সমীক্ষায় মূল সেতু ও রেল সংযোগ সেতু প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সমন্বয়েই প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়।

ঢাকা-যশোর পর্যন্ত ১৭৩ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে মূল পদ্মা সেতুর ভেতরে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণকাজ হচ্ছিল।

একই সঙ্গে মূল সেতুর দুই প্রান্তে অর্থাৎ রাস্তার ওপর দিয়ে প্রায় ৭ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণের কাজ চলমান। আগামী বছরের ডিসেম্বরে এ সেতু দিয়ে যান চলাচল শুরু হওয়ার কথা।

একই দিন রেল সংযোগ সেতু দিয়েও ট্রেনও চলবে- এমন প্রতিশ্রুতি রয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের।

জানতে চাইলে মঙ্গলবার রেলপথমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজন যুগান্তরকে বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্প পরিচালকের একটি চিঠি আমরা পেয়েছি।

তারা জানিয়েছেন, পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের ডিজাইনের ভুলে মূল সেতু দিয়ে ট্রাক-কাভার্ডভ্যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটবে।

সেতুর দুই প্রান্তে রাস্তার ওপর দিয়ে টানা রেললাইনের উচ্চতা কম থাকায় হেডরুম দিয়ে বেশি উচ্চতার যানবাহন সেতুতে ওঠানামা করতে পারবে না।

এটি ২০১৫ সালের চূড়ান্ত সমীক্ষায়ই মীমাংসিত। এতদিন পরে এসে ‘ত্রুটি’র কথা বলা হচ্ছে। পুরো বিষয়টি দেখার জন্য চলতি সপ্তাহে রেলপথ সচিবকে সরেজমিন পাঠানো হচ্ছে।

একই সঙ্গে আগামী সপ্তাহে আমি নিজেই সেটি পরিদর্শন করব। বিষয়টি সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, সমাধানের পথ দ্রুত বের করতে না পারলে প্রকল্পের ওপর এর প্রভাব পড়বে। এমনিতেই একই দিনে সড়ক যানের সঙ্গে ট্রেন পরিচালনা- অনিশ্চয়তা রয়েছে।

মঙ্গলবার দুপুরে পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম জানান, ভয়াবহ ত্রুটির বিষয়টি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষসহ সেতু কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

এ ত্রুটি, ভুলের দায়ভার আমরা নিতে পারি না। সেজন্যই বিষয়টি দ্রুত সমাধানের জন্য কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। মূল সেতুর নকশার বাইরে গিয়ে আমার কিছুই করার নেই।

আমাদের প্রকল্প যথাযথ নিয়ম-নকশা অনুযায়ী সম্পন্ন হচ্ছে। সেতু থেকে যান ওঠার স্থানটি খুবই সেনসেটিভ- এখানে উনিশ থেকে কুড়ি হলেই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

আন্তর্জাতিকভাবে সড়কপথের হেডরুম স্ট্যান্ডার্ড হল হরাইজন্টাল ১৫ মিটার, ভার্টিক্যাল ৫ দশমিক ৭ মিটার রাখতে হবে- যা রেলে মানা হয়নি।

পদ্মা রেল লিংক প্রকল্পে ৪ দশমিক ৮ মিটার উচ্চতা দেয়ায়- সেতুর উভয় প্রান্তের হেডরুম উচ্চতা প্রায় ১ মিটার কম। কম উচ্চতায় রেললাইন নির্মাণ হচ্ছে- এতে যে কোনো ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান আটকে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

এছাড়া সমুদ্রবন্দর দিয়ে আসা কোনো কনটেইনার ট্রাক কম উচ্চতায় সেতুতে উঠতে পারবে না।

মঙ্গলবার দুপুরে পদ্মা রেল সংযোগ সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী গোলাম ফখরুদ্দিন এ চৌধুরী যুগান্তরকে জানান, আমরা মূল সেতু প্রকল্পের পরিচালকের একটি চিঠি পেয়েছি।

তারা ত্রুটি চিহ্নিত করে কাজ বন্ধ রাখতে বলেছেন। আমরা ওই অংশে বর্তমানে কাজ বন্ধ রেখেছি। তবে এতে আমাদের কাজের গতি আরও কমে যাবে।

এখন সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে- একই দিন পদ্মা সেতু দিয়ে সড়ক যানের সঙ্গে ট্রেন চালানোয় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। নতুন এ সমস্যায় প্রকল্প নির্মাণ কাজে গতি কমে আসবে।

আমরা সমীক্ষা অনুযায়ী কাজ করছি। বিশেষ করে সেতুর দু’পান্তে থাকা প্রায় ৫০ শতাংশ পিলার নির্মাণ হয়ে গেছে। শতভাগ পাইল ও ২৫ শতাংশ গার্ডার উঠানো হয়ে গেছে।

আমরা বুয়েটের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। এ ত্রুটি কি করে সমাধান করা যায় তা নিয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করা হচ্ছে। আমরা চাই, চলমান উন্নয়নের ক্ষতি না করে ত্রুটির সমাধান।

কিন্তু, এটি কি করে সমাধান করা যায়- তা নিয়ে সম্মিলিতভাবেই এগোতে হবে। একে অপরকে দোষ দিয়ে সমাধান করা যাবে না।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক যুগান্তরকে জানান, সড়ক উন্নয়নে নদীপথের উন্নয়নকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

ভারতের উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্য-সেভেন সিস্টার্সে বাণিজ্য বাড়াতে নদীপথের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এ বাণিজ্যে নদীপথে থাকা ২৩টি ব্রিজের হেডরুম উচ্চতা যথাযথ না থাকায় সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

পদ্মা সেতুর মতো এতবড় একটি প্রকল্পে এমন সমস্যা দেখা দেয়া খুবই দুঃখজনক। সম্মিলিত প্ল্যান না থাকলে যা হয়। উন্নয়নে যদি সাংঘর্ষিক হয়- তাহলে সেই উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

পদ্মা সেতুর মধ্য দিয়ে রেল সংযোগ সেতু প্রকল্পটিও সুদূরপ্রসারী নয়। ১০০ বছর আগে হার্ডিঞ্জ ব্রিজে যদি ডাবল রেললাইন নির্মিত হয় তাহলে বর্তমানে নির্মিত পদ্মা সেতুর মধ্যে ডাবল লাইন রেল সেতু হতে পারত।

রেলপথ মন্ত্রণালয় চেয়েছিল ডাবল লাইন করা হোক- কিন্তু তা না হয়ে সিঙ্গেল লাইন হচ্ছে। এতে পদ্মা সেতুতে ট্রেন চলাচল সক্ষমতা অনেক কম হবে।

মঙ্গলবার বিকালে রেলওয়ে মহাপরিচালক মো. শামছুজ্জামান যুগান্তরকে জানান, ইতোমধ্যে দুই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক দুই মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে।

যে ত্রুটি দেখা দিয়েছে তা সমাধান করতে হলে ইঞ্জিনিয়ারিং সলিউশনের মাধ্যমে করতে হবে। আমরা এ বিষয়টির সমাধানে দ্রুততার সঙ্গে কাজ করছি।

রেলকেই এর সমাধান করতে হবে- এটা সত্য। এজন্য চলমান প্রকল্পে কী কী ক্ষতি হতে পারে- কিংবা স্থাপিত পিলার, পাইল ও গার্ডারে সংস্কার আনতে হবে কিনা- তা নিয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ১০ হাজার ১৬১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ঋণে পদ্মা সেতু প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। সে সময় শুধু সড়ক সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল।

তবে ২০০৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পদ্মা সেতুতে সড়কের পাশাপাশি রেলপথ সংযোগের সিদ্ধান্ত নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এডিবির মিথ্যাচারিতায় ঋণ না পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী দ্বিতল সেতুর (উপর তলায় যান ও নিচ তলায় ট্রেন) নকশা প্রণয়ন করা হয়।

মন্তব্য করুন