ঢাকা, শনিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১২ আশ্বিন, ১৪২৭
সচিবালয়ে এওপিওদের অসন্তোষ চরমে

সহকারী সচিবের প্রাপ্য পদ সংরক্ষণে গড়িমসি মিলছে না পদোন্নতি

নন-ক্যাডার কোটায় সহকারী সচিব পদে প্রাপ্য পদোন্নতি পাচ্ছেন না সচিবালয়ের প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তারা (এওপিও)। সহকারী সচিবের মোট পদের তিন ভাগের এক ভাগ এওপিওদের মধ্য থেকে নীতিমালা অনুযায়ী পদোন্নতি দেয়ার কথা।

কিন্তু প্রাপ্যতা অনুযায়ী কখনই সঠিক অঙ্কে পদ সংরক্ষণ করে পদোন্নতি দেয়া হয় না। এমন অভিযোগ উত্থাপন করে পদোন্নতিপ্রত্যাশী কর্মকর্তাদের অনেকে যুগান্তরকে জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রায় দেড়শ’ পদ সংরক্ষণ করে পদোন্নতি দেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অথচ এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেই। এ নিয়ে ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। অপরদিকে চাকরির ১০ বছর পূর্তিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে স্বয়ংক্রিয় টাইম স্কেল না দেয়ায় সৃষ্ট ক্ষোভ-অসন্তোষে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।

ক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের অনেকে যুগান্তরকে জানিয়েছেন, এ ধরনের সমস্যা ক্যাডার কর্মকর্তাদের হলে তা কবেই নিষ্পত্তি হয়ে যেত। সব ফেলে তারা নিজেদের স্বার্থের কাজ নিয়ে ছোটাছুটি করতেন। কিন্তু নন-ক্যাডারসহ সাধারণ কর্মকর্তা- কর্মচারীদের ক্ষেত্রে অজুহাত আর কারণের শেষ নেই। তারা ন্যায্য অধিকার নিয়ে কথা বললেই দোষ খোঁজা হয়। যদিও ক্যাডার কর্মকর্তাদের সবাই এমন নেতিবাচক মানসিকতার নন। অনেকে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করে থাকেন বলেই তারা মন্দের ভালো আছেন।

সূত্র জানায়, সহকারী সচিব পদে নন-ক্যাডার কোটা অনুযায়ী বিদ্যমান পদে বাইরে নতুন করে ১৪৩টি পদে পদোন্নতির প্রাপ্যতা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের কোটা অনুযায়ী ২০১৬ সালে থেকে এখন পর্যন্ত প্রাপ্য ৩৩টি পদ সংরক্ষণের চিঠি ইস্যু করা হয়নি। কেননা এ সময়কালে সহকারী সচিবের প্রায় ১০০টি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি বিলুপ্ত ইকোনমিক ক্যাডার থেকে সহকারী প্রধান/সিনিয়র সহকারী প্রধানের ৩৩২টি পদ প্রশাসন ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ফলে এর এক-তৃতীয়াংশ হিসাবে আরও প্রাপ্যতা রয়েছে ১১০টি। কিন্তু এই প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে না হচ্ছে পদের সংরক্ষণ, কিংবা সরাসরি নন-ক্যাডারদের জন্য প্রাপ্য পদ সৃষ্টি করাও হচ্ছে না।

সচিবালয়ের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে কর্মরত সিনিয়র এওপিওদের অনেকে যুগান্তরকে বলেন, আমাদের সঙ্গে একসময় যেসব ক্যাডার কর্মকর্তা সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে চাকরি করেছেন, তারা পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেয়ে সচিব পদেও পদোন্নতি পেয়েছেন। কেউ চাকরিতে আছেন। কেউ গেছেন অবসরে। কিন্তু তারা সেই একই পদের ঘানি টানছেন। এওপিও পদে ১০-১৫ বছরের চাকরি তো অনেকের পার হয়েছে। কেউ কেউ ২০-২৫ বছরও একই পদে আছেন। অথচ যে উদ্দেশ্যে ১৯৯২ সালে সচিবালয় ক্যাডারকে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, সেটি এখন অনেকাংশে ম্লান হতে বসেছে। ফিডার পদধারী এওপিওরা অনেকটা অবহেলিত। সাংগঠনিক আন্দোলন আর দাবিদাওয়া জানানোর পর্ব চরমে রূপ নিলে তখন কিছু পদ সংরক্ষণ করা হয়। তারা বলেন, সব ধরনের জটিলতা এড়াতে দরকার ছিল মন্ত্রণালয় ও বিভাগে যখন সহকারী সচিবের পদ সৃষ্টি হবে, তখনই একই সঙ্গে সহকারী সচিবের জন্য নন-ক্যাডার কোটায় পদ সৃষ্টি করা। যেমন- সহকারী সচিবের ১০টি পদ সৃষ্টি করা হলে সেখানে ৭টি ক্যাডার এবং ৩টি নন-ক্যাডারের পদ সৃষ্টি করলে তাদের পদোন্নতি নিয়ে এত ঝক্কিঝামেলা হতো না। তারা জানান, ইদানীং তো একটা কৌশল নেয়া হয়েছে। যেখানে সহকারী সচিবের পদ প্রয়োজন, সেখানে সহকারী সচিবের পদ সৃষ্টি না করে সিনিয়র সহকারী সচিবের পদ সৃষ্টি করা হচ্ছে। যাতে কোটার ভাগ না দিতে হয়। কিন্তু তারা ভুলে গেছেন, সচিবালয়ের ভিত্তি পদ হল সহকারী সচিব/সিনিয়র সহকারী সচিব। এই ভিত্তি পদের বিপরীতে ১৯৯২ সালে কোটা সংরক্ষণের আদেশ জারি করা হয়। তাছাড়া সিনিয়র সহকারী সচিব পদ কোনো পদোন্নতি নয়, এটি একটি স্কেল মাত্র। তাই সচিবালয়ের এই ভিত্তি পদ যেভাবেই সৃষ্টি করা হোক না কেন, সেখানে তাদের প্রাপ্যতার হক রয়েছে। আর এটি তো কারও দয়ার বিষয় নয়, তাদের অর্জিত অধিকার।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের লিখিত আদেশ রয়েছে। এছাড়া তাদেরকে বঞ্চিত করতে গিয়ে আজও উপসচিবের ৯টি পদ আর বাড়েনি। কিন্তু বাস্তবতা হল, এখন যারা এওপিও পদে কর্মরত আছেন তাদের বেশির ভাগ উচ্চশিক্ষিত। অনেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও লেখাপড়া শেষ করেছেন। কিন্তু নানা কারণে তাদের হয়তো ক্যাডার সার্ভিসে চাকরি হয়নি। জরুরি দরকার থাকায় অনেকে আগে এওপিও পদে চাকরি নিয়েছেন। তাছাড়া মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর প্রতিটি শাখায় যত কাজ হয় তার বেশির ভাগই করে থাকেন প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদেরও অবদান কম নয়। আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগে এসব পদে যারা ছিলেন, তাদের অনেকে হয়তো উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না। কিন্তু এখন তো সে সমস্যা নেই। তাই এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট পদোন্নতি বিধিমালার মধ্যে থেকে যারা সহকারী সচিব পদে দায়িত্ব পালনের যোগ্য বলে বিবেচিত, তাদেরকে পদোন্নতি দিতে বাধা কোথায়।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন) ও বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (সেক্রেটারিয়েট) ক্যাডার একীভূতকরণ আদেশ ১৯৯২ এর ৩(গ) মোতাবেক সহকারী সচিবের মোট পদের এক-তৃতীয়াংশ ফিডার পদধারীদের জন্য সংরক্ষিত। এ বিষয়ে তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয় থেকে ১৯৯২ সালের ১৭ মার্চ গেজেট আকারে আদেশ জারি করা হয়। এর ভিত্তিতে সে সময়কার ৪২২টি সহকারী সচিবের বিপরীতে ১৪১টি পদ নন-ক্যাডারদের জন্য সংরক্ষণ করা হয়।

বর্তমানে নন-ক্যাডার কোটায় সহকারী সচিবের পদ রয়েছে ২৬৭টি। এর মধ্যে ১৯৯২ সালে ১৪১টি সংরক্ষণ করা ছাড়াও ২০০৬ সালের ১২ অক্টোবর ৩২টি, ২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবর ৩৭টি এবং ২০১৮ সালের ২৫ অক্টোবর করা হয় ৫৭টি। এরপর আর করা হয়নি। নন-ক্যাডার কোটায় সিনিয়র সহকারী সচিবের ৭২টি পদ রয়েছে। এর মধ্যে ১৯৯৯ সালের ১ ডিসেম্বর করা হয় ৩৫টি, ২০০৬ সালের ১২ অক্টোবর ১০টি, ২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবর ১২টি এবং ২০১৮ সালের ২৫ অক্টোবর ১০টি।

স্বয়ংক্রিয় টাইম স্কেল জটিলতা : নিয়মানুযায়ী একই পদে চাকরির ৪ বছরে ১টি টাইম স্কেল বা উচ্চতর স্কেল এবং চাকরির ১০ বছরে পরবর্তী সিলেকশন গ্রেড বা উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্য হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে জারি করা স্পষ্টীকরণ পত্রে বলা হয়েছে, চাকরি সন্তোষজনক হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এটি দিতে হবে। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২১ জন কর্মকর্তা ৮ মাস ধরে এ সুবিধা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত। অনেকে লিখিত আবেদন করেছেন। কিন্তু ফল হয়েছে উল্টো।

স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেয়ার কথা থাকলেও এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে। কুচক্রী মহলের ইন্ধনে সেখানে একটি মামলার রেফারেন্স দিয়ে তাদের প্রাপ্য উচ্চতর বেতন স্কেল আটকে দেয়া হয়েছে। যদিও ওই মামলার সঙ্গে তাদের টাইম স্কেলের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে ভুক্তভোগীরা হলেন আবুল বাশার মোহাম্মদ আল আমীন, আবদুস সালাম, জয়তন রায়, মো. নুরুল ইসলাম, আবু তাহের মিয়া, সুলতানা আক্তার, আলমগীর হক, মাঈনুল হাসান, মহিবুল হেকিম, গোলাম মোস্তফা, আসলাম হোসেন, শফিকুর রহমান, মারুফা সুলতানা, নাদিম আহমেদ, জেহাদুল বারী, মোহাম্মদ মোবারক হোসেন, আতাউর রহমান, মুহাম্মদ তৌহিদুজ্জামান, বেগম কানিজ ফাতেমা, আনোয়ারুল ইসলাম ও জিয়াউর রহমান। অথচ অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন অনুবিভাগ, সড়ক পরিবহন ও সেতু বিভাগ, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ বেশির ভাগ মন্ত্রণালয় বিভাগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা প্রাপ্ত উচ্চতর স্কেল সুবিধা যথাসময়ে নিশ্চিত করেছে। ক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের অনেকে যুগান্তরকে বলেন, উচ্চতর বেতন স্কেলের সঙ্গে বেশি অর্থের সংশ্লেষ নেই। বড়জোর ২ হাজার টাকা বেতন বাড়বে। কিন্তু এই দুর্মূল্যের বাজারে তাদের কাছে এই টাকাই অনেক। যেখানে ৫০ টাকার নিচে বাজারে কোনো সবজি পাওয়া যায় না। অথচ ছোট-বড় সব কর্মকর্তাকে তো একই বাজারে যেতে হয়। বেতনবৈষম্য ব্যাপক থাকলেও বাজারে কারও জন্য কোনো ছাড় নেই।

মন্তব্য করুন