ঢাকা, শনিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১২ আশ্বিন, ১৪২৭
বেসরকারি সাত বিশ্ববিদ্যালয়

বহু কষ্টে অনুমোদন, চালুর আগেই অর্ধেক বয়স শেষ

বেসরকারি রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমতি পায় ২০১৬ সালে। একই সঙ্গে অনুমোদন পায় রূপায়ণ শামসুজ্জোহা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ।

এগুলোর মধ্যে শেষেরটি কার্যক্রম শুরু করেছে। কিন্তু প্রথম দুটি এখন পর্যন্ত তা পারেনি। আইন অনুযায়ী কোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সাময়িক সনদ বা অনুমতির মেয়াদ ৭ বছর। সেই হিসাবে অর্ধেকের বেশি সময় পার করেছে এসব বিশ্ববিদ্যালয়। বাকি সময়ের মধ্যে চালু করতে না পারলে অঙ্কুরেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে এসব প্রতিষ্ঠান। অনুমোদন নিয়েও চালু না করা এমন বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৭টি।

একেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন নিতে পূরণ করতে হয় আইনের প্রাথমিক বেশ কিছু শর্ত। এর মধ্যে আছে- আবেদন পর্বেই থাকতে হয় ২৫ হাজার বর্গফুটের বাড়ি। কোনো কোনো উদ্যোক্তা বিপুল অঙ্কের অর্থে ভবন ভাড়া নেন; আবার কেউ বা নিজস্ব বাড়ি ব্যবহার করেন। ৫ কোটি টাকা এফডিআর করতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে। গঠন করতে হয় ট্রাস্টি বোর্ড। প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরিসহ আরও বেশ কিছু ধকল পোহাতে হয়। প্রকল্প পরিদর্শনে মোটা অঙ্কের ফি দিতে হয়। সবমিলে আবেদনের কাজেই ব্যয় হয় বিপুল পরিমাণ অর্থ। এত কিছু পেরিয়ে অনুমোদন মেলা বিশ্ববিদ্যালয় চালু না করায় বিস্মিত ইউজিসির কর্মকর্তারা। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভাগ্য নির্ধারণে সর্বশেষ তথ্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানানোর উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন পাওয়া অনেক কষ্টের। আবেদন করেও অনুমোদন না পাওয়ার সংখ্যা শতাধিক।

দেশে বর্তমানে চালু আছে ৯৬টি বিশ্ববিদ্যালয়। সরকার অনুমতি দিয়েছে ১০৬টি। সেই হিসাবে ১০টি চালু নেই। তবে এগুলোর মধ্যে ৩টি চালুর পর মালিকানা দ্বন্দ্বসহ বেশ কিছু কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি ৭টি অনুমোদন নেয়ার পরও চালু করা হয়নি। এর মধ্যে কয়েকটি অনুমোদন পাওয়ার পর ইউজিসির সঙ্গে যোগাযোগ পর্যন্ত করেনি। কোনোটির পক্ষ থেকে কয়েক বছর আগে সর্বশেষ যোগাযোগ করা হয়েছে। দু-একটি অন্যজনের কাছে বিক্রির চেষ্টাও হয়েছে বলে জানা গেছে।

অনুমোদন নিয়ে চালু না করা প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে- ঢাকায় বেসরকারি রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয় (অনুমোদন-২০১৬), নারায়ণগঞ্জে রূপায়ণ একেএম শামসুজ্জোহা বিশ্ববিদ্যালয় (২০১৬), রাজশাহীতে আহসানিয়া মিশন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (২০১৮), খুলনা খান বাহাদুর আহছানউল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (২০১৮), রাজশাহী শাহ মখদুম ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটি (২০১৮), বরিশালে ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি (২০১৮), ঢাকায় মাইক্রোল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (২০২০)।

প্রস্তাবিত রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের (বিওটি) চেয়ারম্যান ছিলেন প্রয়াত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন বরেণ্য শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। সদস্যদের একজন ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। অধ্যাপক নজরুল শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়টি অনুমোদন নেয়া হয়েছিল কেরানীগঞ্জে। কিন্তু সেখানে কী করে চলবে এটি। এজন্য অনেক চেষ্টা করে উত্তরায় পরিচালনার অনুমতি নেয়া হয়েছে। অফিস চালানো হচ্ছে বনানীতে। জানুয়ারিতে কার্যক্রম শুরুর একটা উদ্যোগ নেয়া হবে।

ইউজিসি কর্মকর্তারা জানান, নারায়ণগঞ্জের রূপায়ণ একেএম শামসুজ্জোহা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ২ বছর আগে একবার ইউজিসিতে যোগাযোগ করা হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়টির সর্বশেষ অবস্থা আর তাদের জানা নেই। প্রতিষ্ঠার ৩ বছর পর কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগ নেয় রাজশাহীর আহসানিয়া মিশন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। কয়েক দিন আগে ক্যাম্পাস পরিদর্শন করেছে ইউজিসির একটি দল। খুলনার খান বাহাদুর আহছানউল্লা বিশ্ববিদ্যালয় চালুর আগেই মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। যদিও প্রতিষ্ঠানটি দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজল চক্রবর্তী নামে একজন যুগান্তরকে জানান, দ্বন্দ্বের অভিযোগ সঠিক নয়। রাজশাহীর শাহ মখদুম ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস পরিদর্শন করে ইউজিসির দল। আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির পর্যাপ্ত জায়গা সংবলিত ভবন নেই। অন্যদিকে প্রোগ্রামের আবেদন করেছিল। বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে ইউজিসি তা মূল্যায়ন করিয়ে রেখেছে। কিন্তু উদ্যোক্তাদের কেউ গত ১ বছরে যোগাযোগ করেনি। বরিশালের ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটিরও একই দশা। অবশ্য প্রতিষ্ঠানের উপ-রেজিস্ট্রার আমিনুল ইসলাম শনিবার জানান, প্রতিষ্ঠানটি চালু করতে যে ভবন ভাড়া নেয়া হয়েছিল সেটি রেল বিভাগ অধিগ্রহণ করে নেয়। এরপর বিওটি নতুন ভবন নিয়েছে। জানুয়ারিতে সেশন শুরুর চিন্তা আছে। উত্তরায় অনুমোদন পাওয়া মাইক্রোল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির করোনার মধ্যে ২ জুন অনুমোদন পায়।

আরও তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম চালাচ্ছে না। এগুলো হচ্ছে- কুইন্স, ইবাইস, ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা। একটি তদন্ত কমিটির সুপারিশে প্রথমটি ২০০৬ সালে সরকার বন্ধ করে দিয়েছিল। পরে মামলার রায়সহ নানা কায়দা করে এটি ২০১৬ সালে চালুর অনুমতি পায়। অনুমতিপত্রে ১ বছরের মধ্যে চালুর কথা ছিল। পরের দুটি মালিকানা দ্বন্দ্বে এগোতে পারেনি। উভয় প্রতিষ্ঠান একাধিক মামলায় জর্জরিত।

তবু প্রতিষ্ঠার আবেদন : জানা গেছে, এরপরও নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে চায় আরও ১০৯টি গ্রুপ। এগুলোর মধ্যে সর্বশেষ ১৯টি পরিদর্শন করে প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে ইউজিসি। আরও ৩টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন বাকি আছে।

মন্তব্য করুন