ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ৭ আশ্বিন, ১৪২৭
সামরিক বলয়ে যোগ দিতে ঢাকার অনীহা

ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে বাংলাদেশকে চায় যুক্তরাষ্ট্র

ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে বাংলাদেশকে অংশীদার করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এ ব্যাপারে শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে টেলিফোন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ড. মার্ক টি. এসপার। বাংলাদেশ অবশ্য সামরিক বলয়ে অংশ নিতে আগ্রহী নয়।

তবে এ স্ট্র্যাটেজি থেকে বাংলাদেশে বেসামরিক অবকাঠামো তথা রাস্তাঘাট উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হলে বিবেচনা করা হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এ বলয়ে এখন পর্যন্ত ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমাতে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি একটি নিরাপত্তা স্ট্র্যাটেজি। বাংলাদেশসহ আরও যেসব দেশকে বলয়ে যুক্ত করতে চায়; এসপার ওই সব দেশের কাছেও টেলিফোন করেছেন।

জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন শনিবার যুগান্তরকে বলেছেন, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের অনুরোধ করছে। আমরা বলেছি, এ উদ্যোগ থেকে বেসামরিক অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করলে আমরা একমত পোষণ করি। এসব অবকাঠামো উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র অর্থ দিলে নেয়া হবে।’

বাংলাদেশ নিরাপত্তা বলয়ে যোগ দেবে কিনা জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন বলেন, ‘আমরা ওই ঝামেলায় যেতে চাই না। যুক্তরাষ্ট্র মাঝে মাঝে আমাদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করতে চায়। এ লক্ষ্যে অস্ত্র বিক্রির চুক্তি করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র এও বলে যে, ভারত তাদের কাছ থেকে অস্ত্র কেনে। তারা বলে, যুক্তরাষ্ট্র অনেক দেশে অস্ত্র বিক্রি করে। আমাদের কাছেও বিক্রি করতে চায়। ট্রাম্পের এটা পলিসি। আমরা শুধু শুনি। আমরা কিছু বলি না। আমরা আমাদের অর্থ দিয়ে গরিবের জন্য ঘরবাড়ি নির্মাণ করব। অস্ত্র কিনে কেন টাকা ব্যয় করব।’

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর টেলিফোন সম্পর্কে ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব স্টেট একটি বিবৃতি দিয়েছে। এতে বলা হয়, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি ড. মার্ক টি এসপার আজ (১১ সেপ্টেম্বর, ২০২০) বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। এ সময় সেক্রেটারি এসপার কোভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নেয়া পদক্ষেপ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর মঙ্গলার্থে তার সাম্প্রতিক কার্যক্রমের প্রশংসা করেন। উভয় নেতা সব দেশের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে একটি অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিকের প্রতি তাদের যৌথ প্রতিশ্রুতি নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং সামুদ্রিক ও আঞ্চলিক সুরক্ষা, বৈশ্বিক শান্তিরক্ষা এবং বাংলাদেশের সামরিক সামর্থ্যকে আধুনিকীকরণের উদ্যোগসহ সুনির্দিষ্ট দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষাবিষয়ক অগ্রাধিকারগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন। উভয় নেতা পারস্পরিক স্বার্থ ও মূল্যবোধের ঘনিষ্ঠ দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সম্পর্ক অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।’

তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা ইস্যু আলোচনায় এসেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সহায়তা করবে।

ঢাকার সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি হল সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব; কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। আমরা কোনো বলয়ভুক্ত হই না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতা রয়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে নিয়মিত সংলাপের ব্যবস্থা আছে। আমরা একে অন্যের সৈন্যদের প্রশিক্ষণ, যৌথ মহড়া এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহায়তা করে থাকি। ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেয়নি। সাধারণভাবে তারা উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছে। তবে প্রস্তাবে নিরাপত্তার উপাদান থাকলে সেদিকে বাংলাদেশ অগ্রসর হবে না।’

এশিয়াতে সামরিক মনোযোগের লক্ষ্যে ওবামার আমলে রি-ব্যালেন্সিং কৌশল নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প ক্ষমতায় যাওয়ার পর ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির দিকে মনোযোগ দেয়া হচ্ছে।

বিশেষ করে এ অঞ্চলে চীনের সামরিক আধিপত্য বৃদ্ধির পর যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারে অধিক মনোযোগী হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হতে যাচ্ছে। নির্বাচনে ট্রাম্প বিজয়ী হলে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন বিজয়ী হলে নিরাপত্তা নীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন হয় সেটা এখনও স্পষ্ট নয়।

ফলে ট্রাম্প প্রশাসন যেসব দেশকে নিরাপত্তা বলয়ে যুক্ত করতে চাইছে; ওই সব দেশ ভোটের আগে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ায় দ্বিধায় আছে।

বর্তমানে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেনের কাছে ফোন করেছেন।

বাংলাদেশ যেন শুধু চীনের দিকে হেলে না থাকে সে ব্যাপারে অনুরোধ করেছেন পম্পেও। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশি পণ্যের রফতানির সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৯০০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করা হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ৩৮০ কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশি সম্প্রদায় প্রচুর রেমিটেন্সও পাঠায়। তবে নিরাপত্তার ব্যাপারে বাংলাদেশ বেশি সম্পৃক্ত হতে চায় না।

কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে বাংলাদেশের রফতানি ক্ষতির মুখে পড়েছে। তাই মার্কিন ক্রেতারা যেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কেনার অর্ডার বাতিল না করেন- এমন অনুরোধ রয়েছে ঢাকার।

পাশাপাশি অন্তত ছয় মাসের জন্য হলেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাককে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামি রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ।

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র আরও জোরালো ভূমিকা পালন করুক এটা বাংলাদেশ চায়। এক্ষেত্রে মিয়ানমারের ওপর চাপ বৃদ্ধি করতে দেশটির ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের কোনো বিকল্প নেই। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা জরুরি।

মন্তব্য করুন