ঢাকা, শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২০, ২৪ শ্রাবণ, ১৪২৭

নির্যাতনের খবর প্রকাশ : নড়াইলে মোবাইল কোর্টের খড়গ এখন গনমাধ্যম কর্মীদের দিকে

রাজু আহমেদ, নড়াইল প্রতিনিধি : গত ১০ দিন ধরে নড়াইলের মোবাইল কোর্টের টার্গেটে পরিনত হয়েছে গনমাধ্যমকর্মীরা। প্রেসক্লাবের সভাপতি, টেলিভিশন সাংবাদিক, পত্রিকার সম্পাদক, রিপোটার্স ইউনিটি ও বাদ যাচ্ছে না। জরিমানা ও গুনতে হয়েছে কয়েকজন সংবাদকর্মীকে। করোনাকালিন মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ছবি তুলতে বাধা দেয়া হচ্ছে। ভিডিও ধারন করায় কয়েক জায়গা থেকে সেসব ভিডিও সাংবাদিকদের কাছ থেকে নিয়ে মুছে ফেলতে বাধ্য করা হচ্ছে। আর এই অবস্থা তৈরী হয়েছে পত্রিকায় মোবাইল কোর্টের হাতে মার খাওয়া ব্যবসায়ীদের প্রতিবেদন করার পর থেকে। এ নিয়ে জেলায় কর্মরত সাংবাদিকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।

১১ মে সদর হাসপাতাল এলাকায় মোবাইল কোর্টের ছবি তুলে ম্যাজিষ্ট্রেট মো.জাহিদ হাসান এর কাছে হেনস্থা হন বিটিভির ক্যামেরায় কাজ করা শুভ সরকার। কেন ভ্রাম্যমান আদালতের ছবি তোলা হলো, এই অভিযোগে তার ক্যামেরায় থাকা ছবি পুলিশ দিয়ে মুছে দেন ঐ কর্মকর্তা।
শুভ সরকারের অভিযোগ, ভ্রাম্যমান আদালত মুখ চিনে মোটর সাইকেল আটকা চ্ছিলেন,পরিচিত হলে তাদের ছেড়ে দিচ্ছিলেন সেই ছবি ধারন করায় ধমকে আমার ক্যামেরার ছবি জোর করে মুছে দিয়েছেন।

একই রকমভাবে ভ্রাম্যমান আদালতের ছবি তোলায় দৈনিক অনির্বান এর জেলা প্রতিনিধি মিলন বিশ্বাস কে পুলিশের মাধ্যমে হেনস্থা করে ছবি মুছে দিতে বাধ্য করা হয়েছে।

১০ মে দুপুরে রূপগঞ্জ চৌরাস্তায় ওয়ালটন মোড়ে ভ্রাম্যমান আদালত স্থানীয় দৈনিক বিডি খবর এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক এড.রাজীব এর মোটর সাইকেল। তাকে ৫’শ টাকা জরিমানা করলে সেই টাকা পকেটে না থাকায় , সাংবাদিক এস কে সুজয় কে টাকা আনতে বলে।সাংবাদিক এসকে সুজয় টাকা দেওয়ার সময় তাকেও জরিমানা দিতে বলেন ঐ ম্যাজিষ্ট্রেট। সাংবাদিক এসকে সুজয় ম্যাজিষ্ট্রেট জাহিদ হাসান কে বলেন স্যার আমি সাংবাদিক বলার সাথে সাথে আরো বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে যান। এসময় ম্যাজিষ্ট্রেটের সামনে পুলিশের সাথে এ বিষয়ে বাকবিতন্ডা হয় জেলা রিপোটার্স ইউনিটির সভাপতি এশিয়ান টিভির জেলা প্রতিনিধি হুমায়ুন কবীর রিন্টুর সাথে।

এখানেই শেষ নয়, ৮মে জরুরী সংবাদ সংগ্রহের জন্য যাচ্ছিলেন নড়াইল প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক আমাদের সময় জেলা প্রতিনিধি এনামুল কবীর টুকু সঙ্গী এনটিভির জেলা প্রতিনিধি মুনীর চৌধুরী। নিশিনাথ তলা এলাকায় ম্যাজিস্ট্রেট মো.জাহিদ হাসান তাদের আটকিয়ে হেলমেট এর প্রসঙ্গে হেনস্থা করেন। একজন সিনিয়র সাংবাদিকের সাথে এহেন আচরনে ক্ষুব্ধ হন মুনীর চৌধুরী।

নড়াইল প্রেসক্লাবের সভাপতি এনামুল কবীর টুকু বলেন, করোনার সময় ঝুকি নিয়ে পিপিই পরে সাংবাদিকরা কাজ করেন। এরপর হেলমেট পরা একটু কষ্টকর। ভ্রাম্যমান আদালতের ম্যাজিষ্ট্রেট জাহিদ যে ব্যবহার করছেন তা অত্যন্ত অবমাননাকর। মনে হয় সাংবাদিকদের উপর তারা কোন প্রতিশোধ নিচ্ছে, এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসককেও অবগত করা হয়েছে।

৬মে ধোপাখোলা মোড়ে এক হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হয়েছে “গাজীটিভি”র জেলা প্রতিনিধি মীর্জা মাহামুদ হোসেন রন্টুকে। ম্যাজিস্ট্রেট আশিক তার কোন ওজোর আপত্তি শুনেননি।

গত ১৩ মে সন্ধ্যায় একুশে টিভির জেলা প্রতিনিধি ফরহাদ হোসেন এবং বনিক বার্তা ‘র ইমরান হোসেন রূপগঞ্জ এলাকায় বাজারের খবর সংগ্রহে যান। মুচিপোল এলাকায় মোবাইল কোর্টের দ্বায়িত্ব পালনকারী ম্যাজিষ্ট্রেট মো.জাহিদ হাসান হেলমেট নাই এই অপরাধে ঐ দুইজনকে ৫’শ টাকা জরিমানা করেন।

সাংবাদিক ফরহাদের অভিযোগ ইফতারির ১৫ মিনিট আগে আধাঘন্টা দাড় করিয়ে রেখে তাদের কে হয়রানি করা হয়েছে। ঐ দিন ভ্রাম্যমান আদালতের কারনে সময়মতো ইফরাতি করা সম্ভব হয়নি, ভ্রাম্যমান আদালতের নামে এটি একটি অমানবিক ব্যাপার।ভূক্তভোগী গনমাধ্যম কর্মীরা এ ব্যাপারে কয়েক দফা সভা করে। সাংবাদিকদের অভিযোগ, ৩ মে মাইজপাড়া বাজারে ভ্রাম্যমান আদালতের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের অভিযোগে সংবাদ সংগ্রহ করতে যায় স্থানীয় সাংবাদিকেরা। ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে ইজিবাইক চালকের মাথার চুলকাটা,কৃষকের হাত ভেঙ্গে দেয়া, আদালতের দ্বায়িতরত পুলিশের মার খেয়ে কয়েক ব্যবসায়ীর শরীরে কালসিটে দাগের তথ্য তুলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় কয়েকটি দৈনিক ও অনলাইনে। ভ্রাম্যমান আদালতের মার খাওয়া একজনকে ডিসি অফিসে গোপনে ডেকে আর্থিক ও খাদ্য সহায়তা দিয়ে সাদা কাগজে স্বাক্ষর রাখে। এর পর থেকেই মুলতঃ ভ্রাম্যমান আদালতের খড়গ নেমে আসে গনমাধ্যম কর্মীদের উপর। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমান আদালতের দ্বায়িত্বে থাকা ম্যাজিষ্ট্রেট দায় এড়াতে পারে না -এমন বক্তব্য দিলেও ব্যবসায়ীদের মারার ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেননি জেলা প্রশাসক। উল্টো “সাংবাদিকরা বানিয়ে সংবাদ প্রচার করেছে”এমন অভিযোগ দাড় করিয়ে গনমাধ্যম কর্মীদের সায়েস্তা করতেই মাঠে ভ্রাম্যমান আদালত।

করোনার দূর্দিনে প্রথম সারির যোদ্ধা সাংবাদিকদের প্রতিশোধমূলক হেনস্থা করার ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছেন দৈনিক ওশানের সম্পাদক এড.আলমগীর সিদ্দিকী,নড়াইল কন্ঠ সম্পাদক কাজী হাফিজুর রহমান,বিডি খবর সম্পাদক লিটন দত্ত,দৈনিক নড়াইল প্রতিদিন সম্পাদক শরীফুল ইসলাম বাবলু ,নড়াইল বার্তা সম্পাদক হাফিজুর রহমান,নড়াইল প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি নাঈমুর রহমান ফিরোজ সহ সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ।

দৈনিক ওশানের সম্পাদক এড.আলমগীর সিদ্দিকী বলেন,গন মাধ্যম মানুষের কষ্টের কথা লিখবে এটাই স্বাভাবিক।জন প্রশাসন যদি সাধারন মানুষের উপর অত্যাচার চালায় তবে দায় তাদের।এই অযুহাতে গনমাধ্যম কর্মীদের প্রতিহিংসামূলক হেনস্তা করা দুঃখজনক। এভাবে চললে সাংবাদিকরা কাজ করবে কিভাবে।

গনমাধ্যম কর্মীদের সায়েস্তা করতে মাঠে নামা নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট নড়াইল জেলা প্রশাসনে সদ্য যোগদানকারী এনডিসি (নেজারত ডেপুটি কালেক্টর) হিসেবে কর্মরত। নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট মো.জাহিদ হাসান মোবাইল কোর্টে সাংবাদিকদের টার্গেট করার কথা অস্বীকার করে বলেন, এসব অভিযোগ তীব্রনিন্দার সাথে প্রত্যাখ্যান করছি।

অভিযোগ বিষয়ে জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা বলেন, মোবাইল কোর্টের বিষয়গুলো আপনারা অন্যভাবে নিলে আমরা ভ্রাম্যামান আদালত পরিচালনা করবো না। মাইজপাড়ার ঘটনার ব্যাপারে আমি আমাদের ম্যাজিষ্ট্রেটদের কঠোর হুশিয়ারি দিয়েছি। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সাংবাদিক কেন কারো ব্যক্তিস্বার্থ ক্ষুন্ন হয় সেটা আমাদের কাম্য নয়।