ক্রীড়াঙ্গন

রাশিয়া, আমি আসছি

ওহ, শান্তি! স্নায়ুবিকল করে দেয়া দুঃসহ চাপ নিয়ে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের অগণিত আর্জেন্টিনা সমর্থকের উৎকণ্ঠার অপেক্ষার শেষটা হল পাগলপারা উদযাপনের মধ্য দিয়ে।

ইকুয়েডরের পবর্তচূড়ায় স্বপ্নভঙ্গের শংকাকে উৎসবের রেণু বানিয়ে অযুত-নিযুত মানুষকে বুক ভরে শ্বাস নেয়ার উপলক্ষ এনে দিলেন একজন জাদুকর। দেশের ভীষণ প্রয়োজনের মুহূর্তেই আসল ভেলকিটা দেখালেন লিওনেল মেসি।

সম্ভব আর অসম্ভবের সীমারেখা মুছে দিয়ে অমূল্য এক হ্যাটট্রিকে একাই আর্জেন্টিনাকে নিয়ে গেলেন বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে। লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচে মেসির দুর্দান্ত হ্যাটট্রিকে ইকুয়েডরকে ৩-১ গোলে হারিয়ে সব সমীকরণ মিলিয়ে সরাসরিই ২০১৮ বিশ্বকাপের টিকিট কেটে ফেলল আর্জেন্টিনা।

মেসি ও আর্জেন্টিনাবিহীন বিশ্বকাপের শংকা কেটে যাওয়ায় গোটা ফুটবল বিশ্বই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সময়ের সেরা ফুটবলারকে ছাড়া রাশিয়া বিশ্বকাপ নিঃসন্দেহে রং হারাত।

টানা তিন ড্রয়ে শেষ রাউন্ডের আগে পয়েন্ট টেবিলের ছয় নম্বরে থাকা আর্জেন্টিনা ছিল ভীষণ শংকায়। ড্র করলেও বেজে যেতে পারে বিদায়ঘণ্টা, আবার জিতলেও সরাসরি বিশ্বকাপ-যাত্রা নিশ্চিত নয়- এমন কঠিনতম সমীকরণ ছিল মেসিদের সামনে।

ম্যাচটি আবার সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৮৫০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত কিটোয়, যেখানে ২০০১ সালের পর আর জেতেনি আর্জেন্টিনা। অসাধ্য সাধনের ভার ছিল যার কাঁধে, সেই মেসিই শেষপর্যন্ত ব্যবধান গড়ে দিয়েছেন।

প্রথম মিনিটেই গোল খেয়ে বসার পর যেভাবে একে একে তিন গোল করে মহাবিপর্যয়ের হাত থেকে দলকে বাঁচিয়েছেন মেসি, তার সত্যিই কোনো তুলনা হয় না।

প্রমাণ হয়ে গেল মেসি শুধু বার্সেলোনার নন, আর্জেন্টিনারও। ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনা কোচ হোর্হে সাম্পাওলি যথার্থই বলেছেন, ‘মেসির কাছে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ পাওনা নেই, বরং ফুটবলের কাছেই বিশ্বকাপটা মেসির পাওনা।’

সরাসরি বিশ্বকাপে যেতে নিজেরা জেতার পাশাপাশি অন্য ম্যাচের ফলও আর্জেন্টিনার অনুকূলে থাকতে হতো। ফুটবল বিধাতা মিলিয়ে দিয়েছেন সেই সমীকরণ। ব্রাজিলের কাছে চিলি ৩-০ গোলে হেরে যাওয়ায় এবং পেরু-কলম্বিয়া ম্যাচে ১-১ গোলে ড্র হওয়ায় শেষপর্যন্ত লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের বাছাপর্বে তৃতীয় হয়েছে আর্জেন্টিনা। এই অঞ্চল থেকে রাশিয়ার ট্রেনে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সঙ্গী হয়েছে উরুগুয়ে ও কলম্বিয়া।

পঞ্চম হওয়া পেরু প্লে-অফ খেলবে ওশেনিয়া অঞ্চলের চ্যাম্পিয়ন নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে। শেষ ম্যাচে ব্রাজিলের কাছে হেরে কপাল পুড়েছে টানা দু’বারের কোপা চ্যাম্পিয়ন চিলির। দ্বিতীয়ার্ধে পাউলিনহো চিলির গোলমুখ খোলার পর গ্যাব্রিয়েল জেসুসের জোড়া গোলে বড় জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে আগেই রাশিয়ার টিকিট কেটে ফেলা ব্রাজিল। হার এড়াতে পারলে অন্তত প্লে-অফের টিকিট পেত চিলি।

কিন্তু বড় হারে পেরুর সমান পয়েন্ট নিয়ে ষষ্ঠ হওয়ায় ২০১৮ বিশ্বকাপ দর্শক হয়েই দেখতে হবে সানচেজ, ভিদালদের। ঘরের মাঠে ভেনিজুয়েলার কাছে ১-০ গোলে প্লে-অফের সুযোগ হারিয়েছে প্যারাগুয়েও।

লুইস সুয়ারেজের জোড়া গোলে বলিভিয়াকে ৪-২ ব্যবধানে হারিয়ে পয়েন্ট টেবিলের দ্বিতীয় স্থানে থেকে বাছাইপর্ব শেষ করেছে উরুগুয়ে। আর পেরুর সঙ্গে ড্র করে চতুর্থ হয়েছে কলম্বিয়া।

বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোরে বাঁচা-মরার শেষ ম্যাচে মাত্র ৩৮ সেকেন্ডে গোল করে আর্জেন্টিনার হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিয়েছিলেন ইকুয়েডরের রোমারিও ইবারা। বিশ্বকাপভাগ্য নিজেদের হাতে রাখতে আর্জেন্টিনাকে তখন অন্তত দুই গোল করতে হতো। চাপের মুখে ভেঙে না পরে উল্টো জাদুর পসরা সাজিয়ে বসলেন মেসি। ২০ মিনিটের মধ্যেই পাল্টে দিলেন পাশার দান। ১২ মিনিটে অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার সঙ্গে ওয়ান-টু-ওয়ান খেলে বাঁ-পায়ের নিখুঁত শটে আর্জেন্টিনাকে সমতায় ফেরান মেসি। ২০ মিনিটে দুর্দান্ত এক দৌড়ে ইকুয়েডরের রক্ষণ তছনছ করে মেসির দ্বিতীয় গোল। বিরতির আগেই ব্যবধান ৩-১ হতে পারত। কিন্তু গোলকিপারকে একা পেয়েও মেসির রক্ষণচেরা পাসকে গোলে অনূদিত করতে পারেননি ডি মারিয়া। দ্বিতীয়ার্ধে আবারও

মেসি ম্যাজিক। ৬২ মিনিটে ইকুয়েডরের তিন ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে জাদুকরী এক লবে দেশের জার্সিতে পঞ্চম হ্যাটট্রিক পূর্ণ করার পাশাপাশি ম্যাচের ফল নিয়ে সব অনিশ্চয়তা মুছে দেন মেসি। এই গোলে রেকর্ডের পাতাও রাঙিয়েছেন আর্জেন্টাইন যুবরাজ। সমান ২১ গোল নিয়ে বার্সা সতীর্থ লুইস সুয়ারেজের সঙ্গে যুগ্মভাবে লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন মেসি। এএফপি/ওয়েবসাইট।

একনজরে ফল

আর্জেন্টিনা ৩ : ১ ইকুয়েডর

ব্রাজিল ৩ : ০ চিলি

পেরু ১ : ১ কলম্বিয়া

উরুগুয়ে ৪ : ২ বলিভিয়া

ভেনিজুয়েলা ১ : ০ প্যারাগুয়ে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *